কর্ষণ তত্ত্ব । Cultivation Theory। CAJ Academy

কর্ষণ তত্ত্ব  Cultivation Theory

টেলিভিশনে মানুষ যা দেখে তা সে বিশ্বাস করে, এটিই হল কর্ষণ তত্ত্ব এর মূল বিষয়। টেলিভিশনে মানুষ যা দেখছে তা তার মনের মধ্যে চাষাবাদের মতো বারবার অনুরণিত হয়ে ওঠে। এই তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন জর্জ গার্বনার ।

জর্জ গার্বনার পরিচিতি :
১৯১৯ সালে ৮ আগস্ট হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালের শেষের দিকে তিনি ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

Advertisement

১৯৪২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগাযোগের উপর যথাক্রমে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬৪-৮৯ সময়কালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Annirligy school for communication এর ডিনইমেরিটাস ছিলেন। তিনি journal of communication এর সম্পাদক ছিলেন। cultural indicators research project এর পরিচালক ছিলেন। তিনি cultural environmental movement এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর সহযোগী হিসেবে ছিলেন Girass, Morgan এবং signorieli

তিনি ১৯৬০ সালে তার এই তিন সহযোগী নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর যাবত এ বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন। ২০০৫ সালে ২৪ ডিসেম্বরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি ফিলাডেলফিয়ার নিজস্ব বাসভবনে মারা যান

কর্ষণ তত্ত্বের পটভূমি :

১৮৬০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক সহিংসতা বিস্তার লাভ করে। এ সহিংসতায় মার্টিন লুথার কিং, জব এফ কেনেডি, মারা যান। সহিংসতার কারণ ও প্রতিরোধের উপায় নির্দেশনার জন্য ১৯৬৭ সালে National Commission on the cause and prevention of violence গঠিত হয়। এটার উপর জর্জ গার্বনার গবেষণা শুরু করেন।

কর্ষণ তত্ত্ব

কর্ষণ তত্ত্ব

১৯৬৮ সালে তার আওতায় Television and Social behavior নামে আর একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। পরে ১৯৭২ সালে তিনি তার তিন সহযোগী মিলে টিভিতে কি পরিমাণ সহিংসতা দেখানো হয় তার একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক তালিকা প্রণয়ন করেন। ১৯৭৬সালে Journal of Communication এ living with television the violence profile নামে গবেষণার ফলাফল টা প্রকাশ করা হয়। জর্জ গার্বনারের কর্ষণ তত্ত্ব গণযোগাযোগে সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্ব। গণযোগাযোগ তত্ত্বে এ নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে।

 Know More…যোগাযোগের দ্বি-ধাপ প্রবাহ তত্ত্ব ও মতমোড়ল 

কর্ষণ তত্ত্বের মূল কথা

cultivation শব্দটি cultivate থেকে এসেছে। Cultivate এর অর্থ হল – চাষ করা, কর্ষণ করা, বিকাশ ঘটানো। কৃষক যেমন জমিতে চাষ করে মানুষও তেমনি মিডিয়াতে যা দেখে তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। টিভিতে মানুষ যা দেখে সেটা সে বিশ্বাস করে, তা লালন করে এবং সেটার বিকাশ ঘটায়।

বাস্তব জীবনের প্রতীকী ঘটনা নিয়ে মিডিয়া কিছু নাটক বা সিনেমা তৈরি করে। গার্বনার দাবী করেন, যারা খুব বেশি টিভি দেখে তাদের মধ্যে বিশ্বাসের অতিরঞ্জন ঘটে। টিভিতে যে সহিংসতা দেখানো হয় তা তারা বিশ্বাস করে এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তাছাড়া তারা মানুষকেও অবিশ্বাস করে।

মার্শাল ম্যাকলুহানের মত গার্বনারও আধুনিক সমাজ গঠনে টেলিভিশনকে প্রভাববিস্তারককারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। বর্তমানে টিভি হচ্ছে পরিবারের অন্যতম সদস্য। গার্বনার বলেন, মানুষ এত মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখে মনে হয় তারা গির্জায় বসে আছে ।
গার্বনার বলেন, যোগাযোগ মাধ্যম এবং সহিংসতার মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি টিভিতে সহিংসতার মাত্রা কতটুকু, কোন শ্রেণীর লোক বেশি টিভি দেখে এবং সমাজের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। নিম্নে তাঁর গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হল –

‌কর্ষণ তত্ত্বের জন্ম :

কর্ষণ তত্ত্ব এর দুইটি দিক রয়েছে। যথা –

১. আধেয় বিশ্লেষণ
২. দর্শক জরিপ

১. আধেয় বিশ্লেষণ :
সচেতন মা বাবা, শিক্ষক এবং সমালোচকেরা ধরে নিলেন টিভিতে পপ্রদর্শিত সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে? গার্বনার সহিংসতা হিসেবে শরীরের মাত্রাতিরিক্ত প্রদর্শন, অস্ত্র সহ অথবা অস্ত্র ছাড়া তেড়ে আসা, কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ জরতে বাধ্য করা, আঘাত বা নির্যাতন করা হত্যার ভয় দেখানো ইত্যাদি তুলে ধরেছেন।

গবেষকরা শীতকালে প্রতি শনি ও রবিবার রাত ৮ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত ( প্রাইম টাইম) যে অনুষ্ঠান গুলো হয় তা রেকর্ড করেন এবং শিশুদের ক্ষেত্রে বন্ধের দিন (শনি ও রবিবার) সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠানগুলো রেকর্ড করে বিশ্লেষণ করেন। এসময়ে তাঁর সহিংসতা কতক্ষণ, বিনোদন কতক্ষণ ইত্যাদির একটা অনুপাত নির্ধারণ করেন।

Advertisement

তারা দেখতে পান যে, আসলেই টিভিতে যে আধেয়গুলো দেখানো হয় তার অধিকাংশ জুড়ে থাকে সহিংসতা, হত্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং হুমকি। নটকগুলোতে ঘন্টায় ৫-৬ টি সহিংসতা দেখানো হয়। ছুটির দিনে যে কার্টুনগুলো দেখানো হয় তাতে ঘন্টায় গড়ে ২০-২২ টি সহিংসতা দেখানো হয়।

প্রাইম টাইমে যে অনুষ্ঠান গুলো দেখানো হয় তার প্রায় অর্ধেক সময়েরও বেশী শারীরিক ভাবে ক্ষতিকর অথবা সহিংসতার হুমকিস্বরূপ এমন অনুষ্ঠান দেখানো হয়। স্কুল জীবন থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত একজন মানুষ ১৩ হাজার মৃত্যুর ঘটনা দেখে।

প্রতি সপ্তাহের টিভি অনুষ্ঠান গুলো তে নায়কদের তিনভাগের দুই ভাগ দিয়ে সহিংস ঘটনাগুলো ঘটানো হয়। এ অনুষ্ঠানে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কেই সহিংসতার স্বীকার দেখানো হয়।

গার্বনার বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, টিভি অনুষ্ঠানে ৫০ ভাগ লোকই মধ্যবিত্ত পুরুষ এবং সেখানে পুরুষের তুলনায় নারীদের উপস্থিতি কম। আমেরিকার এক তৃতীয়াংশ শিশু ও টিনেজার প্রাইম টাইমে তাদের উপস্থিতি ১০ ভাগ। আফ্রিকান আমেরিকানদের দেখানো হয় কিলার রেপিস্ট হবে। এসময়ের অনুষ্ঠানে বয়স্কদের অংশগ্রহণ কম। যারা সরাসরি দেখেন না বলে তারা টিভি বন্ধ করে দেন।

২ .দর্শক জরিপ :
টিভি অনুষ্ঠানের সহিংস আধেয় বিশ্লেষণ করে গার্বনার এবং তার সহযোগীরা দর্শকদের আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির উপর জরিপ চালান। জরিপে দর্শকদের দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে –

ক. Light Viewer
খ. Heavy Viewer

ক. Light Viewer : যারা কমপক্ষে ২ ঘন্টা বা তার কম সময় টিভি দেখে তাদেরকে বলা হয় Light Viewer

খ. Heavy Viewer : যারা ২-৪ ঘন্টা বা তার বেশী সময় টিভি দেখে তাদের Heavy Viewer বলা হয়

গার্বনার light এবং Heavy Viewer দের দৃষ্টিভঙ্গিকে চারভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হল-

১. সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা :
Light Viewer রা বলছে সহিংস ঘটনাগুলো দেখার পর সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ১ শ তে এক ভাগ। কিন্তু Heavy Viewer রা বলেছে ১০ এ এক ভাগ।

২. রাতে একাকী হাঁটার ভয় :
এটা স্বাভাবিক যে, পুরুষের তুলনায় মহিলারা অন্ধকার রাত্রিতে হাঁটতে বেশি ভয় পায়। কিন্তু Heavy Viewer রা Light Viewer দের তুলনায় দশগুণ বেশি সহিংস কর্মকান্ডে ভয় পায়।

৩. পুলিশের কার্যক্রম
Heavy Viewer রা মনে করে সমাজের শতকরা ৫ ভাগ লোক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যুক্ত। তাদের টেলিভিশন জগত পুলিশ, বিচারক এবং সরকারী এজেন্ট দ্বারা ভরপুর। Light Viewer রা মনে করে তা এক শতাংশ

. মানুষের প্রতি অবিশ্বাস
Heavy Viewer রা সবসময় মানুষের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্দিহান থাকে। Light Viewer রা কম।

তবে শিক্ষা দীক্ষা সামাজিক মর্যাদা অর্থাৎ সামাজীকরণে চলকগুলোর কম বেশি উপস্থিতিতে Viewer দের মধ্যে প্রভাবিত হওয়ার মাত্রা কম বা বেশি হবে। এগুলো তাঁর গবেষণায়য় উঠে আসে নি। পরে তিনি এ দুই টি ধারা সংযোজন করেন। যথা :

১. মূলধারায়ন Mainstreaming
২. অনুকরণ Resources

১. মূলধারায়ন :
গার্বনার বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে টিভি দেখে তাদের মধ্যে এমন বিশ্বাস তৈরি হয়। যদিও এগুলোর সাথে বাস্তবের কোন মিল থাকে না। এক পর্যায়ে টিভি দেখতে দেখতে তারা এতটা প্রভাবিত হয় যে, এদের সমাজ, অর্থনীতি নিয়ে বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অবদান কমে যায়।

২. অনুরণন
অনুরণন মানে হচ্ছে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে লুকানো অবস্থায় একটা পশুত্ব বোধ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রকাশিত হয় না। সহিংসতার মনোভাব মনের মধ্যে অনুরণিত হতে থাকে। যদি সে টিভিতে এ ধরনের ঘটনা দেখে তবে সে সময় তার মনের মধ্যে এটা অনুরণিত হতে থাকে। সে মনে করে এটা বাস্তব

সমালোচনা:-
১ গর্বনার শুধু টিভির ক্ষেত্রে এ তত্বেটি প্রয়োগ করেছেন।
২. কি পরিমাণ টিভি দেখলে কি পরিমাণ সহিংসতা কাজ করবে এটা তার গবেষণায় আসেনি।
৩ কেহ বিশ্বাস না করলে তার উপর প্রভাব পড়বে না।
৪. বয়স, বিশ্বাসযোগ্যতা, শিক্ষা ইত্যাদি প্রভাব ফেলে।

কর্ষণ তত্ত্ব

50% LikesVS
50% Dislikes

One Response

  1. আলি আহমেদ নিশান November 24, 2019

Write a Comment

Share It