সংবাদপত্রের মালিকানা ও পরিচালনার ধরন । সুবিধা ও অসুবিধা

সংবাদপত্রের মালিকানা ও পরিচালনার ধরন ,সুবিধা ও অসুবিধা

The community press truly offers opportunity for everyone, from the beginner who wants a solid journalism background to the career newsman who wants to be happy until he has own paper.- Garrett w. Ray

Advertisement

সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে মালিকানা বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদপত্র কিভাবে পরিচালিত হবে, কিংবা সমাজে এর ভূমিকা কী হবে তা সাধারণত সংবাদপত্রের মালিক নির্ধারণ করেন। সংবাদপত্রের জন্মলগ্নে ছিল আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন । যে সময় মুদ্রাকরাই ছিলেন সংবাদপত্রের মালিক।। সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে ছাপা খানায় তখন অন্যান্য ছাপার কথা হতো।

সংবাদপত্র ছাপা প্রাণরান্তে ছিল গৌণ । । ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত ছোট ছোট সংবাদপত্র এখনো জনপ্রিয়।। আধুনিককালে সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা, শিক্ষার প্রসার ও পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দৈনন্দিন কাজকর্ম আরও জটিল হয়েছে। অবশ্য জনসেবার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে ও পরিচালন ব্যবস্থার পদ্ধতিও বদলে গেছে ।

সংবাদপত্রের মালিকানা ধরন

ঔপনিবেশিক যুগে সংবাদপত্রের মালিক ও পরিচালক মুদ্রাকর নিজেই এবং তিনি সংবাদপত্রকে তার মুদ্রণ ব্যবসায়ের পরিপূরক হিসাবে দেখতেন। কিন্তু বর্তমানে কিছু কিছু দেশে এক্ষেত্রে অনেক উন্নতি ঘটে । এবং সংবাদপত্রের মালিকানার বিভিন্ন ধরনও পৃথক ধরনের সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন পদ্ধতি জটিল হয়ে পড়েছে।

Rucker and williams তাদের newspaper organization and management গ্রন্থে সংবাদপত্র মালিকানা ও পরিচালনাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন এগুলো হলো। –

1.ব্যক্তিগত মালিকানা

2.অংশীদারি মালিকানা

3. করপোরেশন মালিকানা

4. দলগত ও যুক্ত মালিকানা

5. কর্মচারী মালিকানা

6. শীর্ষ মালিকানা

7. যৌথ মালিকানা

সংবাদপত্রের মালিকানা
সংবাদপত্রের মালিকানা

নিম্নে সংবাদপত্রের মালিকানা ধরন ধারণের বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

Advertisement

1. ব্যক্তিগত মালিকানা

একজন ব্যক্তি হাতে যখন সংবাদপত্রের পূর্ণ মালিকানা থাকে তখন তাকে বলা হয় ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত এই কাগজে সাধারণত দেখা যায়, যিনি মালিক তিনিই সম্পাদক এবং ব্যবস্থাপক যে কোন পদে তিনি কাজ করতে পারেন। ভারতের প্রথম কাগজ Bengal gazte এরকম এক ব্যক্তি মালিকানার ‌অধীনেই প্রকাশিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কাগজ public occurrence ও প্রকাশিত হয়েছিল এক ব্যক্তি মালিকানার অধীনে । যার প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন চীনের বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ।

একক মালিকানার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা থাকে একই ব্যক্তির হাবে । মালিকানার সূত্রে তিনিই হল সম্পাদক । এক্ষেত্রে মালিক এককভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করেন । যে কোন সিদ্ধান্ত তিনি একইভাবে গ্রহণ করে থাকেন। । তবে সংবাদপত্রের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাকে এককভাবে বহন করতে হয়।

বর্তমানে এই ধরনের মালিকানা অস্থিত্ব দেখা যায় সপ্তাহিক বা পাক্ষিক পত্রিকার ক্ষেত্রে । দৈনিক পত্রিকার ক্ষেত্রে একব্যক্তি মালিকানা প্রায় অচল। এর প্রধান কারণ হলো আধুনিক দৈনিক সংবাদপত্র তৈরি করতে আজকে যে পুঁজি ও উদ্যোগের প্রয়োজন তা একজন মাত্র ব্যক্তির পক্ষে যোগান দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার। ছোট মাপের সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় হলো ব্যক্তিগত উদ্যোগের পক্ষে আদর্শ । তবে কিছু জাতীয় দৈনিকেও ব্যক্তিগত মালিকানা দেখা যায় ।যেমন -জনকণ্ঠ পত্রিকার মালিক ও সম্পাদক হলেন আতিকুল্লাহ খান মাসুদ।

ব্যক্তি মালিকানার সুবিধাসমূহ

ব্যক্তিগত মালিকানার চরিত্র বিশ্লেষণ করে কিছু সুবিধা উল্লেখ করা হলো । যথা-

1. এ ধরনের মালিকানায় মালিক- সম্পাদক পত্রিকার উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

2. সম্পাদকীয় ও ব্যাবসায়িক নীতিমালার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মালিক পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন।

3. মালিক তার ব্যবসায়ের পুরো মুনাফা লাভ করেন বিধায় কাজে আন্তরিকতার অভাব হয় না।

4. কাগজের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । অর্থাৎ, তার পত্রিকা ও তিনি হয়ে উঠেন এক ও অভিন্ন ।

5. একক মালিকানার কারণে মালিক সংবাদপত্রে তার ব্যক্তিগত মতাদর্শ প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম।

6. স্বাধীনভাবে পত্রিকা পরিচালনা করতে পারেন।

ব্যক্তিগত মালিকানার অসুবিধাসমূহ

ব্যক্তিমালিকানার কিছু অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আছে।

1. বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি মালিকানা তেমন উপযুক্ত নয়।

2. মালিকের উপর অপরিসীম দায়িত্ব বর্তমানের কারণে মালিক সম্পাদক এর ব্যক্তিগত সামর্থ, যোগ্যতা ও কৃতিত্বের উপর পত্রিকার সাফল্য নির্ভর করে।

3. ব্যক্তি মালিকানার প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রাপ্তি কঠিন । কারণ , মালিকের মৃত্যুতে তার উত্তরাধিকারের যোগ্যতা ও সামর্থের ব্যাপারে ঋণদাতা সংশয় মুক্ত হতে পারে না।

4. প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ সম্ভব নয় । প্রধান অন্তরায় হল পুঁজির অভাব।

5. প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়ের জন্য তিনি একাই দায়ী।

6. মালিকের মৃত্যুর পর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

7. এ জাতীয় মালিকানায় পত্রিকা একক ভাবে পরিচালিত হয় বলে এখানে কখনো কখনো স্বেচ্ছাচারিতা বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা থাকে।

8. সংবাদপত্রের যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতি মালিক কে এককভাবে গ্রহণ করতে হয়।

2 . অংশীদারিত্ব মালিকানা

দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একই পত্রিকা প্রকাশ বা ক্রয় কিংবা পরিচালনার উদ্দেশ্যে মালিকানা চুক্তি করলে অংশীদারিত্ব মালিকানা গড়ে উঠে। এ চুক্তি লিখিত অথবা অলিখিত হতে পারে এ ধরনের মালিকানায় বিভিন্ন সামর্থ্য ,যোগ্যতা ও আর্থিক অবস্থার ব্যক্তির মধ্যে মেধার সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ব্যক্তির অংশগ্রহণের সীমানা নির্ধারিত হয়। সাধারণত বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী এই সীমানা ঠিক হয় । অংশীদারি মালিকানা সাধারণত লিমিটেড কোম্পানি হয়। যেমন-channel I , ntv এর মালিক এনায়েত রহমান বাপ্পি ও মোসাদ্দেক হোসেন ফালু

অংশীদারি মালিকানার সুবিধাসমূহ

অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের মতো সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও অংশীদারিত্ব মালিকানার অস্তিত্ব বহুভাবে দেখা যায়।। বহু সংবাদপত্র অংশীদারি মালিকানার অধীনে তৈরি হচ্ছে এবং পরিচালিত হচ্ছে । নির্দিষ্ট কিছু শর্তের অধীনে এই মালিকানা কাজ করায় এর কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন-

1. এ ধরনের মালিকানায় বিভিন্ন সামর্থ্য ,যোগ্যতা ও আর্থিক অবস্থায় ব্যক্তির মধ্যে মেধার সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

2. প্রকাশনা শিল্প সম্পর্কে অনভিজ্ঞ অথবা ধনবান ব্যক্তির কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করা যায়।

3. এখানে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দেওয়া হয় বলে চাপা অনেক কমে যায়।

4. এক ধরনের মালিকানায় একাধিক ব্যক্তির বিচার বিবেচনা কাজ লাগানো যায়।

5. অংশীদারদের স্বার্থএক ও অভিন্ন বলে এরা সাফল্যের জন্য সাময়িকভাবে শ্রম দিয়ে থাকে।

6. সকল অংশীদার নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

অংশীদারি মালিকানার অসুবিধাসমূহ

অংশীদারী মালিকানার কিছু অসুবিধা রয়েছে। যেমন-

1. কোন অংশীদার নেই রীর না করে অন্যের করেন দায়ভার বহন করেন।

2. প্রত্যেক সংবাদপত্র পরিচালনায় অধিকার রাখেন বলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।

3. কোন দায়িত্ব জ্ঞানহীন অংশীদার তার দায়িত্ব অবহেলা করলে অন্য অংশীদারের মুনাফা ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

4. অংশীদারিত্ব মালিকানায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়া সম্ভব।

5. অংশীদারের মধ্যে মুখ ক দেখা দিলে অংশীদারিত্ব ভেঙ্গে যেতে পারে। ।

অংশীদারি মালিকানার প্রকারভেদ

অংশীদারিত্ব মালিকানা দুই ধরনের হতে পারে যেমন –

1. সাধারণত অংশীদারিত্ব।

2. লিমিডেট অংশিদারিত্ব।

1. সাধারণ অংশীদারিত্ব

অংশীদারিত্ব মালিকানা কোন নতুন পত্রিকা চালু করা , ক্রয় করা বা প্রকাশ করার সঙ্গে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির জড়িত হওয়ার চুক্তির উপর নির্ভরশীল। এখানে প্রত্যেক অংশীদারের দায়িত্ব থাকে অপরিসীম । এক ধরনের মালিকানায় প্রত্যেকেই একজন পত্রিকাযর সাধারণত প্রতিনিধি এবং যে কোনো একজন অংশীদার সকলের পক্ষে দায়িত্ব পালন করতে পারেন । এখানে সকলের অংশীদারিত্ব ও দায়িত্ব সমান এবং তারা প্রত্যেকে সম পরিমাণ অর্থের যোগান দেন।

2. লিমিডেট অংশীদারিত্ব

লিমিটেড অংশীদারিত্বে একজন সাধারণ প্রকাশক থাকেন । যিনি একজন সাধারণ অংশীদার । সাধারণ অংশীদার সীমিত দায়িত্বের ভিত্তিতে অতিরিক্ত মূলধন সরবরাহকারীদের মালিকানা প্রদান করেন। লিমিটেড পার্টনারের সংবাদপত্রের চুক্তিকরণ বা নিয়ন্ত্রণ করার কোন অধিকার তাকে না।

আরো জানুন ……….মিডিয়ার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ । মিডিয়া মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের Osmo Wiio তত্ত্ব

3. কর্পোরেশন মালিকানা

সরকার ও জনগণের অংশীদারিত্বে যে সংবাদপত্র পরিচালিত হয় তাই কর্পোরেশন মালিকানা । দৈনিক সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে কর্পোরেশন মালিকানা পশ্চিমা বিশ্বে বহুল প্রচলিত । আমাদের দেশে এটি এখনো চালু হয়নি নি । ব্যবসার বিস্তার, কেন্দ্রীয়করণ অথবা মালিকানার আংশিক পরিবর্তনের জন্য এধরনের মালিকানা বেশ গ্রহণযোগ্য । এ ধরনের মালিকানায় একটি স্পষ্ট ব্যবসায়িক ভিত্তি থাকে । এটি সরকার এবং জনগণের মধ্যে হয়ে থাকে । এ জাতীয় মালিকানায় ৫১% থাকে সরকারের হাতে আর ৪৯% থাকে জনগণের হাতে।

কর্পোরেশন মালিকানার সুবিধাসমূহ

দৈনিক সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে কর্পোরেশন মালিকানার ব্যবস্থা অনেক সুবিধাজনক । এর প্রধান কারণ হলো- এই ধরনের মালিকানায় নমনীয়তা অনেক বেশি । এর সুবিধাসমূহ নিম্নরূপ-

১. এ ধরনের মালিকানায় মামলা মোকাদ্দমার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত দায়- দায়িত্ব কম থাকে।

২. কর্পোরেশন মূলধন বৃদ্ধি করেও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিস্তৃত করা যায়।

৩. নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর সহজতর । অর্থাৎ, অংশীদার সহজে তার অংশ হস্তান্তর করতে পারে।

৪. স্টক মালিকানার পরিবর্তনের ফলে পত্রিকার ব্যবসার কোন ক্ষতি হয় না।

৫. অর্থ সংকটে সরকার অর্থের যোগান দিতে পারে।

৬. সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়।

কর্পোরেশন মালিকানার অসুবিধা

কর্পোরেশন মালিকানার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে । যেমন –

১. কর্পোরেশন কঠোর ভাবে নিয়ম-নীতির উপর নির্ভরশীল বিধায় নির্দিষ্ট সময় পরপর সবকিছুই প্রতিবেদন প্রদান করতে হয়।

২. এখানে ষ্টক হস্তান্তর কর এবং অন্যান্য কর্পোরেশন কর আরোপিত হয়।

৩. এ ধরনের মালিকানায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দুইবার আয়কর দিতে হয় । যেমন- একবার কর্পোরেশনের আয়ের উপর কর এবং আরেকবার শেয়ার মালিকদের ব্যক্তিগত আয়ের উপর কর।

৪. নীতি নির্ধারণের বেলায় সরকারের প্রভাব থাকে ।

৫। এখানে সরকারের স্বার্থই বেশি কাজ করে।

৬. সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে স্বাধীনভাবে কাজ করা যায় না।

4. দলগত বা যুক্ত মালিকানা

অন্যান্য শিল্প বা বাণিজ্যিক উদ্যোগের মতো একাধিক সংবাদপত্র আর্থিক , প্রশাসনিক বা সম্পাদনার উদ্দেশ্যে একটি জোট বদ্ধ মালিকানার সৃষ্টি করতে পারে। এখানে ব্যবসায়ীক লাভ, সম্পাদকীয় নীতি ও প্রশাসনিক ব্যপারে একই রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

একই মালিকের অধীনে যদি একটি ব্যবসা বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন হয়, তবে এই ধরনের ব্যবসায়ের মালিকানাকে যুক্ত মালিকানা বলে । অর্থাৎ, সংবাদপত্র যদি একই সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত হয় তবে ঐ সংবাদপত্রের মালিকানা কে যুক্ত মালিকানা বলে । যেমন- প্রথম আলো ঢাকা ,চট্টগ্রাম ,সিলেট থেকে একযোগে প্রকাশিত হচ্ছে।

আবার, একই মালিকানায়, একই ব্যবস্থাপনায়, একই স্থান থেকে যদি বিভিন্ন ধরনের দৈনিক ,সাপ্তাহিক ,মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় তবে এই ধরনের মালিকানাকে দলগত মালিকানা বলে। যেমন- ইত্তেফাকের প্রকাশনা হলো হলো, ইত্তেফাক , বিডি নেশন, রোববার ইত্যাদি।

সংবাদপত্র দলগত মালিকানা এর পরিচালনার ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে হোল্ডিং কোম্পানি মোট স্টকের ৫১% নিয়ন্ত্রণ করে। হোল্ডিং কোম্পানি প্রত্যেক সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতিমালার ব্যাপারে দৃষ্টি রাখে । আবার প্রত্যেক সংবাদপত্রকে নিজস্ব নীতিমালা নির্ধারণের অনুমতিও দিয়ে থাকে। বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র , যেমন- নিউজ প্রিন্ট , যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সাধারণত প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। প্রত্যেক সংবাদপত্রের দৈনিক ,সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রতিবেদন হোল্ডিং কোম্পানি কে দিতে হয়।

দলগত বা যুক্ত মালিকানা সুবিধাসমূহ

১. কেন্দ্রীয় অফিসের মাধ্যমে কাঁচামাল কেনা যায় এবং বেশি পরিমাণ কেনার জন্য তুলনামূলক কম মূল্যে তা কেনা সম্ভব হয়।

২. দলগতভাবে ও অভিজ্ঞতার বিনিময়ের ফলে প্রকাশকের শক্তি ও সাহস বেড়ে যায়।

৩. এক ধরনের মালিকানায় সংবাদপত্রে কর্মরত সাংবাদিকরা ষ্টক ক্রয়ের সুযোগ পায়।

৪. কেন্দ্রীয় ভাবে হিসাব -নির্দেশ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।

৫. মুদ্রণ খরচ কম পড়ে।

৬. সকল পত্রিকার জন্য একই যান্ত্রিক সুবিধা ব্যবহার করা যায়।

৭. জাতীয় স্তরে একটি গ্রুপের সকল কাগজের জন্য বিজ্ঞাপনের জায়গা বিক্রি করা যায়।

দলগত যুক্ত মালিকানার অসুবিধাসমূহ

১. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রকাশনা পরিব্যাপ্ত থাকার ফলে আঞ্চলিক স্বার্থ অনেক সময় উপস্থিত হয়।স্বাথ । মালিকানা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয় বলে সবসময় জাতীয় স্বার্থেই প্রাধাণ্য পায়।

২‌. গ্রাহকরা অনেক সময় মনে করে এখানে দূর নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে পত্রিকা চলানো হয়। যেহেতু মালিকরা সম্পাদকের নিকটবর্তী নয়।

৩. সকল কাগজের জন্য সমান মেধা ও মনোযোগ দিতে হয়। এর ব্যতিক্রম হলে কোন পত্রিকা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৪. কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা দেখা দেওয়ায় বিশেষ পত্রিকার সমস্যা উপেক্ষিত হয়।

৫. কর্মচারী মালিকানা

অন্যান্য শিল্পের মতো সংবাদপত্রের শেয়ার যদি কর্মরত কর্মচারীরা কিনে ফেলে তবে তারাই মালিক হয়ে যায়।। কোন সংবাদপত্রের মালিক যারা গেলে কিংবা মালিকানা হারালে এর পরিবর্তী উত্তরাধিকারী কে হবে এ সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে সংবাদপত্রের শেয়ার কর্মচারীদের হাতে বিক্রি হয়ে থাকে।অধিকাংশ শেয়ার যখন কর্মচারীদের হাতে চলে আসে তখন এরাই পত্রিকার মালিক হযয়ে যায় ।

কোন মালিক সংবাদপত্র চালাতে অক্ষম হলে বা মালিক অবসর গ্রহণ করলে ,আবার কখনো তার কর্মচারীদের আন্তরিকতার প্রতিদান হিসেবেও মালিকানা হস্তান্তর হতে পারে। মালিকানার মাধ্যমে সংবাদপত্র পরিচালনার জন্য কর্মচারী মালিকানায় ষ্টাফ ট্রাস্ট চুক্তি সম্পাদন করা হয় । বাংলাদেশে এ ধরনের মালিকানায় প্রকাশিত সংবাদপত্র হলো- দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভার।

কর্মচারী মালিকানায় সুবিধাসমূহ

১. কর্মীরা প্রকৃত মালিক“ এই ধারণা কর্মীদের দায়িত্ব ও সততা বৃদ্ধি করে।

২. আন্তঃব্যক্তিয় বাধা বাধা বিপত্তি সহজে দূর হয়

৩. প্রত্যেক্ষ অংশ থাকার কারণে কর্মীরা সংগঠনের স্বার্থ সংরক্ষণ করে।

৪. উৎপাদন, বেতন, কাজের সময় প্রভৃতি সমস্যার সহজ সমাধান হয়।

৫. এখানে শ্রমিক-মালিক বিরোধ দেখা দেয় না।

৬‌ . কর্মীরাই সংবাদপত্রের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

কর্মচারী মালিকানার অসুবিধাসমূহ

১. সংবাদপত্রের সম্পত্তি প্রয়োজনে বিক্রি করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

২. প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগেও অসুবিধা দেখা দেয়।

৩. কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

৪‌. চাকরির মেয়াদ দীর্ঘ হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

৫‌. কর্মচারীদের লভ্যাংশ পুনরায় বিনিয়োগের মানসিকতা থাকে না।

৬. কোন পদ খালি হলে নিয়োগে তাদের স্বজনপ্রীতি ঘটে।

৬. উলম্ব বা শীর্ষ মালিকানা

একটি মালিকানা ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য এবং সংবাদপত্র থাকলে তাকে বলা হয় শীর্ষ মালিকানা । এই সমস্ত শিল্প ব্যবসার সাথে সংবাদপত্রের যোগ থাকবে।। কোন একটি কর্পোরেশন মালিকানার অধীনে রেডিও স্টেশন , টিভি স্টেশন, বিজ্ঞাপন সংস্থা ,কাগজ কল এবং সংবাদপত্র থাকতে পারে। সংবাদপত্র ছাড়া অন্যান্য যে ব্যবসা সাধারণ মালিকানার অধীনে রয়েছে তার সংবাদপত্রের প্রকাশে প্রভূতভাবে সাহায্য করতে পারে। । কারণ, প্রতিটি ব্যবসার সঙ্গেই সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। যেমন – পদ্মা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাবাজার পত্রিকার মালিক। এদের বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও রয়েছে ।এগুলো একটি আরেকটির পরিপূরক।

শীর্ষ মালিকানা সুবিধা

১. সংবাদপত্র প্রকাশের সকল উপকরণ খুব সহজে জোগাড় করা যায়।

২ . সংবাদপত্রের সঙ্গে অন্যান্য গণমাধ্যমের সংযোগ স্থাপনের ফলে পাঠকের কাছে যেভাবে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হয় তার মান অনেক বৃদ্ধি পায়।

৩. সংবাদপত্রের ব্যয় সংকোচন সম্ভব।

৪. সংবাদপত্রের লভ্যাংশকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়।

শীর্ষ মালিকানার অসুবিধাসমূহ

১. প্রকাশকের লভ্যাংশ বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে দায়িত্বও বেড়ে যায়।

২. সংবাদপত্রের প্রতি মনোযোগ দিতে অসুবিধা হয়।

৩. এক ধরনের মালিকানায় লভ্যাংশ কখনো কখনো সংবাদপত্রের প্রসারে বিনিয়োগ না হয়ে অন্যান্য ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা হয়। এইজন্য সংবাদপত্রে উন্নয়ন ব্যহত হয়।

৭. যৌথ মালিকানা

সংবাদপত্রের যৌথ মালিকানা হচ্ছে একই এলাকায় পৃথক মালিকানাধীন দুই বা ততোধিক পত্রিকার সমবায়ভিত্তিক পরিচালনা পদ্ধতি। এ ধরনের মালিকানা গড়ে ওঠে ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যয় হ্রাসের উদ্দেশ্যে । যৌথ মালিকানায় একই স্থান থেকে কাগজ বের হয় কিন্তু এদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সংবাদ অফিস ও বাণিজ্যিক অফিস থাকে, রিপোর্টার থাকে, সম্পাদক থাকে ,বিজ্ঞাপন ও প্রচার কর্মী থাকে । তাছাড়া প্রত্যেক পত্রিকার নীতিমালা সমূহ নিজেরা প্রণয়ন করে থাকে। থাকে।

মুদ্রণ শিল্পের প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে এ ধরনের মালিকানা করে উঠেছে। যৌথ মালিকানায় প্রকাশিত সংবাদপত্র সমুহের মধ্যে আর্থিক দায়-দায়িত্ব বণ্টনের জন্য একটি যুক্তি করা হয় কিংবা সকল পত্রিকার মূলধনের প্রতিনিধিকারী কর্পোরেশন বোর্ড গঠন করা হয়।

যৌথ মালিকানা সুবিধাসমূহ

১. এ ধরনের মালিকানায় ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যয় হ্রাস পায়।

২. উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

৩. বিজ্ঞাপন দাতারা সাধারণ বিজ্ঞাপন হারে বিজ্ঞাপন দিতে পারে।

৪. যৌথভাবে সংবাদ ও বিজ্ঞাপন বিষয়ে কাজ করা যেতে পারে বলে কর্মচারী সংখ্যা কম প্রয়োজন হয় ।

৫. প্রতিযোগিতার কুফল থাকেনা , বরং সংবাদপত্র অনেক বেশি সমাজ মুখী হয়।

যৌথ মালিকানার অসুবিধাসমূহ

১. একই উৎপাদন ব্যবস্থায় নিজ নিজ সংবাদপত্রের নিজস্বতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

২. প্রতিযোগিতা হ্রাস পাওয়ার ফলে একটি পত্রিকার বিশেষ কোন দিকের উন্নয়ন ব্যহত হয়।

৩. সীমাবদ্ধ প্রতিযোগিতায় মালিকের প্রত্যাশিত মুনাফা কম হতে পারে।

100% LikesVS
0% Dislikes

Write a Comment

Share It