সম্পর্ক গঠনের ১০টি ধাপ । 10 Steps to Build Relationship

পূজা মজুমদার

সম্পর্ক গঠনের ১০টি ধাপ 10 Steps to Build Interpersonal Relation

‘Mutual understanding is the main backbone of every happy relationship’ -Edmond

সম্পর্ক হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তির আন্তঃক্রিয়াশীল অনুভূতি প্রকাশের একটি অদৃশ্য মাধ্যম যা অনেকগুলো পারিপার্শ্বিক বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। সম্পর্ক শব্দের অর্থ ‘সম পরিমাণ কর্তৃত্ব’।যখন পরষ্পরের মধ্যে সমান পরিমাণ কর্তৃত্ব প্রকাশের অনুভূতি তৈরি হয় তখন সেটাকেই আমরা সম্পর্ক বলি।

Collins এর মতে,’ The relationship between two people or groups it is the way in which they feel and behave towards each other, the way in which they are connected.”

Advertisement

আমরা যে পরিমন্ডলে বসবাস করি তা আসলে সম্পর্কের একটি জটিল জাল।আমরা জন্মানোর সাথে সাথেই আমাদের সাথে কিছু সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। যেমনঃ মা,বাবা,দাদি ইত্যাদি। কিছু সম্পর্ক আমরা জীবন অতিবাহিত করতে করতে তৈরি করি।যেমনঃ ছাত্র-শিক্ষক, স্বামী-স্ত্রী ইত্যাদি।

আমাদের তৈরি করা বা আমাদের সাথে তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো প্রতিটিই অনন্য, জটিল ও পরিবর্তনশীল।বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কজালে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের জড়িয়ে ফেলি।যেমনঃ

রোমান্টিক সম্পর্কঃ Deborah Shelley মনে করেন প্রতিশ্রতি,আসক্তি ও অন্তরঙ্গতা এই তিনটি উপাদানের সংমিশ্রণেই রোমান্টিক সম্পর্ক তৈরি হয়। রোমান্টিক সম্পর্ক দুই ধরনের- সমলিঙ্গ ভিত্তিক-গে, লেসবিয়ান, বিপরীতলিঙ্গ ভিত্তিক-বাগদত্তা,স্বামী স্ত্রী । রোমান্টিক সম্পর্কে কখনো স্বীকৃতি পাওয়া যায়, কখনো যায় না।

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কঃ বন্ধুত্ব এক ধরনের পারস্পরিক অনুরাগ। বোঝাপড়া,চিন্তাভাবনা মিল,অমিলের উপর ভিত্তি করে এ ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠে।সমলিঙ্গ,বিপরীত লিঙ্গ উভয় ক্ষেত্রেই বন্ধুত্ব হতে পারে।আমাদের দেশে বন্ধুত্বের স্বীকৃতি নেই।তবে প্রাচীন গ্রীসে বন্ধুত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হতো। বন্ধুত্ব আমাদের কাছে এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক যে সাহিত্য-সিনেমা সবক্ষেত্রেই এর প্রভাব রয়েছে। ‘গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ। ‘-রবি ঠাকুর।

পারিবারিক সম্পর্কঃ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা চাই বা না চাই আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে যুক্ত থাকতেই হয় । সবসময় তা রক্তের সম্পর্কই হবে এমন টা নয়। যেমনঃ ভাই-বোন,ননদ-দেবর ইত্যাদি।

কর্ম ও কর্তব্য ভিত্তিক সম্পর্কঃ কর্মস্থলে আমরা এ ধরনের সম্পর্কে যুক্ত হই। যেমনঃ অফিসের সহকর্মী। আমাদের সাথে যুক্ত সম্পর্কগুলো চিরস্থায়ী হয় না।

Mark L. Knapp এর ‘Relationship Development Theory’ তে বলা হয়েছে সম্পর্ক কতোগুলো ধাপ অতিক্রম করে গড়ে এবং ভাঙে। তিনি এখানে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক গঠনের ১০টি ধাপ এর কথা উল্লেখ করেছেন । নিচে তাঁর উল্লেখিত সম্পর্ক গঠনের ১০টি ধাপ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

1. Initiating (সূচনা)

2. Experimenting ( যাচাইকরণ)

3 .Intensifying ( তীব্রতা বৃদ্ধি )

Advertisement

4. Integrating (সংহতকরণ)

5. Bonding ( বন্ধন)

6. Differentiating ( পার্থক্য করা )

7. Circumscribing ( বিসর্জন)

8. Stagnating ( স্থিরতা )

9. Avoiding ( এডিয়ে চলা )

10. Terminating ( সমাপ্তি)

আরো জানুন ………আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ এর মূলনীতি । Principles of Interpersonal Communication

সম্পর্ক গঠনের ১০টি ধাপ
সম্পর্ক গঠনের ১০টি ধাপ
  1. Initiating ( সূচনা )

এটা সম্পর্ক গড়ার প্রথম ও সংক্ষিপ্ত ধাপ।মাঝে মাঝে এতো সংক্ষিপ্ত হয় যে এর ব্যপ্তি ১০-২৫ সেকেন্ড ও হয়ে থাকে।এ ধাপে পরষ্পরের সাথে প্রথম যোগাযোগ হয় এবং তা চলমান থাকবে কিনা তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কথায় আছে, ‘First impression is the last impression.’ তাই ব্যক্তি তার সেরা নিজস্বতাকে প্রদর্শনের চেষ্টায় থাকে।এ ধাপে সাধারণত নাম, পরিচয়,শুভেচ্ছা বিনিময় বিষয়ক কথাবার্তা হয় এবং খুব কম কথা হয়। যেমনঃ ‘আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগলো।’

2. Experimenting ( যাচাইকরণ)

প্রথম ধাপে প্রাথমিক পরিচয় হওয়ার পর এ ধাপে ব্যক্তি অপর ব্যক্তি সম্পর্কে আরও বেশি জানার চেষ্টা করে। তবে এ ধাপে পরষ্পরের সাথে বলা কথাগুলো অধিকাংশই অগভীর ও প্রাথমিক তথ্য নির্ভর হয়।কথাবার্তার ধরন নৈমিত্তিক হলেও Mark L. Knapp এর মতে, এর বিশেষ কিছু উপকারিতা রয়েছে। যেমনঃ

-এটা অনাগত বন্ধুত্ব তৈরির একটা কার্যকর উপায়।

-সম্পর্কের অনিশ্চয়তা হ্রাস করে।

-ব্যক্তি পরষ্পরের সাথে কেমন ধরনের সম্পর্কে যুক্ত আছে তা বুঝতে পারে।

Knapp এর মতে,আমাদের অধিকাংশ জনের সাথে সম্পর্ক এ পর্যায় থেকে আর সামনে আগায় না।

3. Intensifying( তীব্রতা বৃদ্ধি )

আগের ধাপগুলোতে সম্পর্কে গভীরতার অভাব ছিলো। এ ধাপে গভীরতার শুভ সূচনা হয়। ব্যক্তির বাচনিক ও অবাচনিক যোগাযোগের ধরনে পরিবর্তন আসে এবং আনুষ্ঠানিকতা কমে। পরষ্পরের সাথে ব্যক্তিগত তথ্যের আদান- প্রদান হয়।অনেক সময় বিশেষ কিছু উপায়ে সম্পর্কটিকে যত্ন করতে দেখা যায় ।যেমনঃ উপহার দেওয়া নেওয়া, একসাথে সময় কাটানো ইত্যাদি।পরষ্পর পরষ্পরের থেকে প্রতিশ্রুতি আশা করে।

4. Integrating (সংহতকরণ)

এ ধাপে দুজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি একটি দ্বিতয়ে পরিনত হয়।পারষ্পরিক ঐকতান তীব্র হয়।সম্পর্কের ধরন কেমন যেমনঃ বন্ধুত্ব, দম্পতি নাকি অন্য কিছু তা স্পষ্ট হতে থাকে।পরষ্পরের খোঁজ খবর রাখেন।একে অন্যের সাথে নিজের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, মূল্যবোধ শেয়ার করেন। সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বাড়তে থাকে।

5. Bonding ( বন্ধন)

এটি সম্পর্ক উন্নয়নের শেষ ধাপ। এ ধাপে একের প্রতি অন্যের প্রতিশ্রুতি পরষ্পরকে জানানো হয়। সম্পর্কটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।এ স্বীকৃতি প্রেমের ক্ষেত্রে হতে পারে বিয়ে বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে হতে পারে কোনো চুক্তি। সম্পর্ক পরিচালনার জন্য বিশেষ নিয়ম কানুনের ব্যবহার হতে পারে।তবে সম্পর্ক পরিচালনার এ পরিবর্তন প্রাথমিক অস্বস্তির বা মানসিক দ্রোহের সূচনা করতে পারে।

6. Differentiating ( পার্থক্য করা )

এ ধাপে ব্যক্তি অপর স্বত্ত্বার সাথে একীভূত হওয়া নিজের স্বত্ত্বাকে স্বতন্ত্র করতে চায়।পরষ্পরের থেকে বন্ধনমুক্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।নিজেদের পছন্দের বিষয়গুলোর থেকে নিজেদের পছন্দের পার্থক্য বেশি চোখে পড়ে।নিজেদের একতার চেয়ে নিজেদের বিভেদগুলো বেশি দৃশ্যমান হয়।যা পারষ্পরিক বন্ধনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

‘A great relationship is about two things. First, appreciating the similarities and second, respecting the differences.’

Knappএর মতে,এই ধাপ সাধারণত পারষ্পরিক সম্পর্ক দ্রুত গভীর হওয়ার ফল। রোমান্টিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে এই ধাপ বেশি প্রবল হয়।পরষ্পর থেকে কিছু সময়ের জন্য কিছুটা ব্যবধান এ ধাপে তৈরি সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে।

7. Circumscribing ( বিসর্জন)

এ ধাপে উভয় পক্ষ থেকেই যোগাযোগের প্রকৃতি ও পরিমাণের অবনতি হতে থাকে।সচেতনভাবেই পরষ্পরের সাথে কথা বলার বিষয় ও সময় কমতে থাকে যা সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একটা অগ্রসরমান সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থগিত হতে শুরু করে।সম্পর্ক নিয়ে এক ধরনের অবসাদ কাজ করে।গভীরতা প্রায় থাকেই না।

8. Stagnating ( স্থিরতা )

আগের ধাপ হতেই সম্পর্ক স্থবির হওয়া শুরু করেছিল। এ ধাপে তা পূর্ণতা পায়।একে অপরের সাথে যোগাযোগ প্রায় হয় ই না।সম্পর্ক হয়ে যায় প্রাণহীন, অচল, চাঞ্চল্যহীন।এতে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। মূলত, সম্পর্ক থাকে না শুধু সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি থাকে। নানা কারণে সম্পর্কে স্থবিরতা আসে।যেমনঃ ধর্মীয় কারণ ,আর্থিক কারণ, সন্তানজনিত কারণ, অন্য ব্যক্তির প্রতি আকর্ষিত হওয়া।

9. Avoiding ( এডিয়ে চলা )

এই ধাপে ব্যক্তি পরষ্পর থেকে পৃথক হওয়ার ধাপে চলতে শুরু করে। মানসিকভাবে আলাদা হয়ে যায়।সচেতনভাবে পরষ্পরকে এড়িয়ে চলে।একে অপরের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য রাখে। একজন কথা বলতে চাইলে অন্যজন তা অপ্রীতিকর করে তুলতে চায়। এ ধাপ থেকেই সম্পর্ক ভাঙার আনুষ্ঠানিক রূপ দৃষ্টিগোচর হতে থাকে।

10. Terminating ( সমাপ্তি)

এই ধাপে পরষ্পরের বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়, সম্পর্ক শেষ হয়। সম্পর্ক শেষ হওয়ার আনুষ্ঠানিকতার সময় কতো হবে, ধরন কেমন হবে, পারষ্পরিক সম্মতি নাকি অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্যে দিয়ে শেষ হবে তা সম্পর্কে যুক্ত ব্যক্তিদের অনুভূতির উপর নির্ভর করে।

লেখক : শিক্ষার্থী

৩য় বর্ষ
জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

100% LikesVS
0% Dislikes

Write a Comment

Share It