সাংবাদিকতার প্রাচীন ইতিহাস । Ancient History of Journalism

সাংবাদিকতার প্রাচীন ইতিহাস

পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস ২০ লক্ষ বছর হলেও লিখার প্রচলন শুরু হয়েছে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর আগে। সমাজ তাত্ত্বিকদের মতে, মানুষের জীবন প্রণালির ইতিহাসের স্তর ৩টি। যথাঃ

Advertisement

বন্য

বর্বর

ও সভ্য সমাজ।


বন্য ও বর্বর স্তর পেরিয়ে ব্রোঞ্জযুগে নগর সভ্যতার বিকাশের মাধ্যমে মানুষের সভ্য সমাজ ব্যবস্থার পদচারণা শুরু হয়।

ব্রোঞ্জযুগে নগর সভ্যতার বিকাশ প্রচার হতে থাকার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠে বিভিন্ন সভ্যতা। যেমনঃ মিসরীয় সভ্যতা, মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, ব্যাবলনীয় সভ্যতা,ফিনিশীয় সভ্যতা,ইনকা সভ্যতা,সিন্ধু সভ্যতা ইত্যাদি।মিসরীয় সভ্যতার উদ্ভব ঘটে হায়ারোগ্লিফিক্স বা পবিত্র লিপি থেকে।

ব্যাবলনীয় সভ্যতার মহান সম্রাট হাম্মুরাবী(Hammurabi) একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তার প্রণিত আইনকে হাম্মুরাবী আইন বা Code of Hammurabi বলা হয়।ব্যাবলনীয় সভ্যতায় লেখা হয়েছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য গিলগাম্মেশ(Gilgamesh)।

সাংবাদিকতার প্রাচীন ইতিহাস


Learn More…. গণমাধ্যমের উৎপত্তি ও বিকাশ। হাতে লেখা যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান ইন্টারনেট যুগ পর্যন্ত

সমসাময়িককালে, নীলনদের অববাহিকায় প্রচুর নলখাগড়া উৎপাদিত হত।যা থেকে প্যাপিরাস(Papyrus) নামের এক ধরনের কাগজ পাওয়া যেত।এই প্যাপিরাস ছাড়াও গরু,ছাগল, মহিষ,ভেড়া ও উটের চামড়ায় মূল্যবান দলিলপত্রসহ অনেক কিছু লিপিবদ্ধ করে রাখা হত।এগুলোকে বলা হত ভেলাম ও পার্টমেন্ট।

খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ এর দিকে চীনে সভ্যতার উন্মেষ ঘটে।চীনারা প্রথম ৫০০ লিপি উদ্ভাবন করেছিল।এসকল লিপির ৪০ থেকে ৫০টি পড়লেই লিখতে ও পড়তে পারা যেত।চীনা ভাষার এই যে মৌলিকত্ব তা এখনও অটুট রয়েছে।

২৫০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় সিন্ধু সভ্যতার উদ্ভব হয়।সিন্ধু সভ্যতা সম্পূর্কে বিস্তারিত না জানা গেলেও একটা বিষয় স্পষ্ট যে তাদের নিজস্ব লিখন পদ্ধতি ছিল।মেসোপটেমিয়া, মিসর ও চীনের অনুসরনে এখানে লিখন পদ্ধতির বিস্তার ঘটে ছিল।


১২০০ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে লেবানন এলাকায় ফিনিশীয় সভ্যতার উদ্ভব ঘটে।ইতিহাসে ফিনিশীয়দের অবদান হল বর্ণ বা এ্যালফাবেটের ব্যবহার।তাদের বর্ণের একটি বিশেষত্ব ছিল যে, তাদের লেখার কোনো স্বরবর্ণ ছিল না।এই লিপিতে লেখা একটি মৃদিত পাথর মৃত সাগরে পাওয়া যায়।যেখানে– মোয়াবের রাজা ও ইসরাঈলের রাজার মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল।

ফিনিশীয়রা লিখন পদ্ধতির যে রূপ দান করেছিল গ্রিকরা স্বরবর্ণ সংযোজনের মাধ্যমে লিপি পদ্ধতিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায়।রোমানরা একটি চূড়ান্ত ও সামগ্রিক রূপ দিয়ে তা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে যোগাযোগ পদ্ধতিকে সুষম ও সহজতর করে তুলেছিল।

লিপি পদ্ধতি আবিষ্কার হবার পর মানুষ চিন্তা-ভাবনা শুরু করে কিভাবো সময়,অর্থ ও শ্রম বাঁচিয়ে যোগাযোগকে আরো গতিশীল করা যায়।তারই ধারাবাহিকতায়, ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানীর জোহানেস জেনসকিচ গুটেনবার্গ টাইপ আবিষ্কার করেন।

তখন থেকেই ইউরোপে মুদ্রণ ইতিহাসে নবযুগের সূচনা হয়।তাঁর মুদ্রিত বাইবেল ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’ নামে পরিচিত।গুটেনবার্গের মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যেই মুদ্রণ ব্যবস্থা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পরে।

Advertisement

এভাবে মুদ্রণব্যবস্থা ধীরে ধীরে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্র ছড়িয়ে পরে।ভারতীয় উপমহাদেশে মুদ্রণযন্ত্র নিয়ে আসে পর্তুগীজ পাদ্রিরা ১৫২৬-২৭ সালের দিকে।

প্রাচীন রোমে তিন রাস্তার মোড়ে বিভিন্ন
দালান-কোঠা থেকে জানিয়ে দেওয়া হত দেশের পক্ষ থেকে কী বলা হচ্ছে। তিন রাস্তার এই মোড়কে বলা হত ‘Trivia’

অনেকের মতে, প্রথম সংবাদপত্র পাওয়া যায়, জুলিয়াস সিজারের আমলে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০ এর দিকে।সেই সময়ে রোমে এক ধরণের লোক কাজ করতো যাদেরকে বলা হত সংবাদ লেখক বা News writer. তারা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে প্রাত্যহিক দিনলিপি সংগ্রহ করতো।সম্রাট জুলিয়াস সিজারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত Acta-diarma কে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সংবাদ নামে অভিহিত করা হয়।

এগার থেকে চৌদ্দ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় Town criers বা নগর লেখক নামে লোক নিয়োজিত ছিল।যেসব জাহাজ সমুদ্র বা নদী বন্দরে ভিড়তো সেইসব জাহাজের প্রান্ত সংবাদ চিৎকার করে এবং ঘণ্টা বাঁজিয়ে শোনানো হত।

সমসাময়িক কালে, ইরাকের রাজধাণী বাগদাদে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে, যার নাম ছিল Clear house of information. এই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তির পদবী ছিল Shihab-ul-Barid বা master of past. বাংলা অর্থ তাক ও তথ্য বিভাগের মহাপরিচালক।

আবার, ভারতবর্ষে মৌর্য বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের অর্থমন্ত্রী কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে ‘ওভারসিয়ার্স’ নামে এক ধরণের লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়– যারা গুপ্তচর বৃত্তির কাজে নিয়োজিত ছিল।

সম্রাট আকবরের নব রত্ন পরিষদের অন্যতম পন্ডিত আবুল ফজল প্রণীত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থের ১৬৯ নম্বর ধারায় তিন ধরণের লেখকের কথা উল্লেখ করা হয়।যথাঃ ১.খুফিয়া নবিস ২.ওয়াকিয়া নবিস ৩.সাবানি নিগার।

অতএব, উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়– প্রাচীন সাংবাদিকতার সাথে বর্তামান সাংবাদিকতার মাঝে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।সাংবাদিকতার উদ্ভব হয়েছিল মূলত সাম্রাজ্যবাদকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। কিন্তু বর্তমান সাংবাদিকতা অনেক স্বাধীন ও জনস্বার্থের অনুকূলে বলিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সক্ষম।

সাংবাদিকতার প্রাচীন ইতিহাস

50% LikesVS
50% Dislikes

Write a Comment

Share It